মাসায়েল ২৪
সহযোগিতা

কওমী মাদরাসার উস্তাদদের উদ্দেশ্যে মুফতি তাকী উসমানী (হাফি.) এর গুরুত্বপূর্ণ নসীহত

মুফতি শরীফ মালিক
•
১৩ অক্টোবর, ২০২৬
৩৯৬ বার পঠিত
কওমী মাদরাসার উস্তাদদের উদ্দেশ্যে মুফতি তাকী উসমানী (হাফি.) এর গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
শেয়ার করুন:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালার। দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের একজন খাদেম হিসেবে আমি আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।

আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে নিজ নিজ মাদরাসায় দ্বীন ও দ্বীনী শিক্ষার খাদেম হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, নানা প্রতিকুলতা ও সংকটের মধ্যেও আপনারা যেভাবে ইখলাস ও নিষ্ঠা বজায় রেখে অক্লান্ত পরিশ্রমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। তারপরও ইলমে নববীর পাহারাদার হিসেবে আপনাদেরকে কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

এক. মাদ্রাসায় শিক্ষকতা সওয়াবের কাজের পাশাপাশি অনেক বড় দায়িত্বও বটে। তাই এই পথে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সমস্যা ও সংকটের মোকাবেলা করতে হয়। এই সকল সমস্যা ও সংকট সমাধানে মাধ্যম ও কৌশল গ্রহণ করা যতটুকু জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি আল্লাহ তাআলার শরণাপন্ন হওয়া।

দুই. শিক্ষকদের উচিত মাদ্রাসার নির্ধারিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ছাত্রদেরকে এ বিষয়টা ভালোভাবে বুঝানো যে, ইলমে দ্বীন কখনো নিজের ওপর অন্যের কর্তৃত্ব বরদাশত করে না। তাই ইলমে দ্বীন অর্জনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে হবে ইলমের সামনে―যাতে করে ছাত্ররা নিয়মিত দরসে অংশগ্রহণ, তাকরার ও স্বতন্ত্র মুতালাআর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়, সর্বদা ক্লাসে মনোযোগ সহকারে পাঠ গ্রহণ ও অনুধাবনের ব্যাপারে মনোনিবেশ করে। কোনো বিষয় পরিপূর্ণরূপে না বোঝা পর্যন্ত যেনো অধ্যয়ন ও পরিশ্রম চালিয়ে যায় । অপ্রয়োজনীয় আলাপ, আড্ডার আসর, মোবাইলের মতো আত্মঘাতী বিষ থেকে বাঁচার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। শিক্ষকরাও মূলত ছাত্র, কেননা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের সময়। তাই তাদেরও এসকল বিষয় মেনে চলা দরকার।

তিন. শিক্ষকদের উচিত ছাত্রদেরকে নিজের সন্তান মনে করে ভালোবাসা ও যত্নের সাথে নিঃস্বার্থভাবে তালিম ও তরবিয়ত প্রদান করা। প্রতিদিনই পাঠদানের পূর্বে ঐ বিষয় এবং ঐ শাস্ত্র সম্পর্কে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা। যদি কোনো বিষয়ে বুঝে না আসে অথবা কোনো আপত্তি বা সংশয় সৃষ্টি হয়, তাহলে লজ্জা বা কোনো ধরনের সংকোচ আমলে না নিয়ে অবিলম্বে শিক্ষকের দ্বারস্থ হওয়া। পাঠদানের পূর্বে এমনভাবে প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে নির্ধারিত পাঠের প্রতিটি শাখা-প্রশাখা চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

ছাত্রদের স্মৃতিশক্তি ও যোগ্যতা অনুযায়ী কতটুকু পড়ালে এবং কীভাবে পড়ালে তারা গ্রহণ করতে পারবে— সে বিষয়েও ভেবে দেখা। কঠিন বিষয়গুলো যথাসম্ভব সহজ করে পড়ানোর ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। পড়ানোর পর কয়েকজনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে নিশ্চিত হওয়া যে, তারা পরিপূর্ণ বুঝতে পেরেছে কি না। নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে ঐ শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ অধ্যয়ন করা, চাই তা প্রতিদিনের পাঠদানে প্রয়োজন পড়ুক বা না পড়ুক।

চার. শিক্ষদের উচিত ছাত্রদের আরবি ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন পড়ানোর পাশাপাশি ভাষার প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক পাঠের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া। কিতাব পড়ার সময়েই ছাত্রদের ভাষাগত ও ব্যকরণগত ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং ভুলগুলো তাদেরকেই ব্যাকরণের আলোকে শুদ্ধ করতে বলা।

পাঁচ. শিক্ষকদের উচিত ছাত্রদেরকে কিতাবের আরবি টীকা ও আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে সহায়তা গ্রহণে অভ্যস্ত করে তোলা। তাদের সামনে উর্দু (অর্থাৎ অনারবি ভাষার) টীকা ও ব্যাখ্যাগ্রন্থকে এমন ভাবে উপস্থাপন করা যে, তারা এগুলো পড়া তো দূরে থাক, হাত লাগানোকেও খারাপ মনে করে। বর্তমানে উর্দু (অর্থাৎ অনারবি ভাষার) ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলো ছাত্রদের মূল গ্রন্থ থেকে পাঠোদ্ধার করার যোগ্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই মূল আরবি গ্রন্থ পড়তে অভ্যস্ত করে তোলা।

ছয়. পাঠদানের পাশাপাশি ছাত্রদের ধার্মিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া নিজেদের জন্য ফরজ মনে করা। সকল ছাত্রকে প্রত্যহ জামাতে তাকবিরে উলার সাথে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব বোঝানো। অবহেলা করলে, বোঝানোর চেষ্টা করা ও প্রয়োজনে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া।

সাত. ছাত্রদেরকে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সর্বাবস্থায় কোনো না কোনো জিকিরে অভ্যস্ত করে তোলা দরকার। এর জন্য পরিচালক ও শিক্ষকবৃন্দ নিজেরা জিকিরে অভ্যস্ত হয়ে তাদের সামনে উদাহরণ পেশ করা। বিশেষ করে তৃতীয় কালিমা ও দুরুদ শরীফ বেশি বেশি পাঠ করা।

আট. বর্তমানে আমাদের তালিম-তর্বিয়তের মূল উৎস হলো আকাবিরে দেওবন্দের তালিম-তরবিয়ত, রাহনুমায়ী ও আখলাকে হাসানাহ। এর মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে আত্মশুদ্ধির আগ্রহ ও স্পৃহা তৈরি হয়। তাই সব মাদ্রাসায় প্রতিদিন কমপক্ষে দশ মিনিটের জন্য হলেও নির্ধারিত একটা সময় একত্রিত হয়ে আকাবিরে দেওবন্দের জীবনী, বয়ান ও মালফুযাতের কিতাব থেকে কিছু কিছু পড়ে শোনানোর ব্যবস্থা করা দরকার।
বিশেষ করে নিম্নোক্ত কিতাবগুলো:

* আপবীতি, লেখক: শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ জাকারিয়া কান্ধলবি রহ.।

* হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসিম নানুতবি রহ.-এর জীবনী, লেখক: মাওলানা মুহাম্মাদ মুনাযির আহসান গিলানি রহ.।

* কুতুবে আলম মাওলানা রশিদ আহমাদ গঙ্গুহি রহ.-এর জীবনী, লেখক: মাওলানা মুহাম্মাদ আশিক ইলাহি মিরাঠি রহ.।

* শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ.-এর জীবনী, লেখক: মাওলানা সাইয়্যিদ আসগর হুসাইন রহ.।

* হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ.-এর জীবনী, লেখক: খাজা আজীজুল হাসান মাজযুব রহ.।

* মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি রহ.-এর জীবনী, লেখক: মাওলানা আশিক ইলাহি মিরাঠি রহ.।

* নকশে হায়াত, লেখক: শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ.।

* শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ.-এর জীবনী, লেখক: মাওলানা আব্দুশ শাকুর তিরমিযি রহ.।

* তাজাল্লিয়াতে উসমানি, লেখক: মাওলানা আনোয়ারুল হাসান শেরকুটি রহ.।

* মাজালিসে হাকিমুল উম্মত, লেখক: মুফতি শফি রহ.।

এছাড়াও খুতুবাতে হাকিমুল ইসলাম এর মতো আকাবিরে দেওবন্দের বিভিন্ন খুতুবাত বিস্তারিত হওয়ার কারণে পুরোটা আয়ত্ত করা যদিও কষ্টসাধ্য, তবুও কোনো শিক্ষক সেখান থেকে আত্মশুদ্ধিমূলক আলোচনাগুলো বাছাই করে ছাত্রদের সামনে বয়ান করবেন। আর পুরোটা নিজে নিজে অধ্যয়নের জন্য ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়া। সাথে সাথে ছাত্রদের সুবিধার জন্য পাঠাগারে উপরোক্ত প্রত্যেকটি বইয়ের একাধিক কপির ব্যবস্থা রাখা।

নয়. দৈনন্দিন জীবনে ইত্তেবায়ে সুন্নতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। ইবাদতের সুন্নাতের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, উত্তম চরিত্র, ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করা, নম্রতা, সহনশীলতা, অমুখাপেক্ষিতা, স্বনির্ভরতা, সহমর্মিতা, অপরের কল্যাণ কামনা ইত্যাদি আখলকা-সংক্রান্ত সুন্নাতের প্রতিও ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ সৃষ্টি করা । এসব বিষয়ে তদারকি করা আর অবহেলা করলে সতর্ক করা।

দশ. সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন দ্বীন ও সুন্নাতের মৌলিক চাহিদা। তাই সর্বদা ছাত্রদের এলোমেলো ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনাচরণ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে নামাজের কাতার ছাড়াও সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।

এগারো. ইসলামে সম্পর্ক, বন্ধন ও সামাজিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, নিজের কথা ও হাতের মাধ্যমে অন্যকে কষ্ট না দেওয়া। এই মূলনীতির আলোকে তাদের স্বভাব ও চরিত্র গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে কোনো অবহেলা বা শৈথিল্য দৃষ্টিগোচর হলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বারো. আউলিয়া কেরাম ও বুজুর্গদের সংস্পর্শ ও ভালোবাসা ছাত্রদের অন্তরে গেঁথে দেওয়া। সাথে সাথে একথাও তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দেওয়া দরকার যে, বুজুর্গদের সংস্পর্শ ছাড়া বেশিরভাগ মানুষ খাঁটি ও একনিষ্ঠ ইমানদার হতে পারে না।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তার পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন।

শ

মুফতি শরীফ মালিক

লেখক

মুহাদ্দিস, গবেষক ও ফতোয়া আলোচক

শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত আরও ফতোয়া ও প্রবন্ধ