জামায়াতে ইসলামী উপমহাদেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি রাজনৈতিক দল। যার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯)। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে তাঁর নেতৃত্বে ‘জামায়াতে ইসলামী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মওদূদী চিন্তাধারার বুনিয়াদী একটি দিক হলো— ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী, নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে রাজনীতিমুখী এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বস্ব একটি দর্শনরূপে চিত্রায়িত করা। যেন ইসলামের সবকিছুর আবির্ভাব একমাত্র রাজনীতি এবং রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করার নিমিত্তেই আবর্তিত হয়। ফলে ‘খুতবাহ’ গ্রন্থের ৩১৫ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, মূলত মানুষের নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তাসবীহ-ই বড় ইবাদত, জিহাদ ও ইসলামী হুকুমত কায়েমের প্রস্তুতির জন্য ট্রেনিং কোর্সমাত্র। তার এ লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ প্রদান করতে ইসলামের যে কোনো বিষয়কে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, তাঁর ক্ষুরধার কলমের বলিষ্ঠ উপস্থাপন অল্পদিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে তার প্রবর্তিত ও মডারেট ইসলামী ভাবধারার দিকে টানতে সক্ষম হয়। তার রচনাকর্মে এমন আকর্ষণ ও মাধুর্য ছিল যে, সে যুগের বহু খ্যাতিমান আলিম পর্যন্ত তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। যাদের মধ্যে মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী রহ. (মৃত্যু: ১৪২০ হি.) মাওলানা মনযুর নোমানী রহ. (মৃত্যু: ১৪২০ হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যখন তাঁরা তার নিকটবর্তী হলেন এবং তার চিন্তাধারা ও মতাদর্শ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেন, তখন একে একে সবাই তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন।
তবে এর আগেই শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. (মুত্যু: ১৩৭৭ হি.) জামাতের বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি দিয়েছিলেন। কেননা জামাতে ইসলামীর দস্তুরুল আমল (সংবিধান) এর ষষ্ঠ ধারা দেখেই তিনি এর বিভ্রান্তির মাত্রা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাতে উল্লেখ ছিল— “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাড়া অন্য কাউকে সত্যের মানদণ্ড (মিয়া’রে হক) মনে করা যাবে না। কারো মানসিক দাসত্বে আবদ্ধ হওয়া যাবে না”। (গঠনতন্ত্র, বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামী পৃ: ১১, ২২তম সংশোধনী ২০১৯ ইং)
হযরত মাদানী রহ. এ বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন— “সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী? তাঁরাও কি সত্যের মাপকাঠি নন?” জবাবে বলা হয়েছিল— হ্যাঁ, তাঁরাও সত্যের মানদণ্ড নন। এখান থেকেই মতপার্থক্যের সূচনা। সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন আমাদের আকাবিরগণ অনতিবিলম্বে তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পাশাপাশি মওদূদীবাদের বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতিগুলো বিভিন্ন লিখনি ও বক্তব্যের আলোকে তারা জনসম্মুখে প্রচার ও প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নিম্নে তাঁর কিছু অসঙ্গতি, বাতিল চিন্তাধারা পর্যালোচনাসহ উপস্থাপনের প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ!
১. আল কুরআনের ব্যাপারে মওদূদী সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি:
মওদূদী সাহেব “কুরআন কী চার বুনিয়াদী ইসতেলাহেঁ” গ্রন্থে বলেছেন, “কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় এ শব্দগুলোর (ইলাহ, রব, দ্বীন ও ইবাদত) যে মৌল অর্থ প্রচলিত ছিল, পরবর্তী শতকে ধীরে ধীরে তা পরিবর্তিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এক একটি শব্দ তার সম্পূর্ণ ব্যাপকতা হারিয়ে একান্ত সীমিত বরং অস্পষ্ট অর্থের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে।” (কুরআন কী চার ব্ুিনয়াদী ইসতিলাহ, পৃ: ১২, আধুনিক প্রকাশনী ঢাকা)
এর এক পৃষ্ঠা পর তিনি লিখেছেন, “এটা সত্য যে, কেবল এ চারটি মৌলিক পরিভাষার তাৎপর্যে আবরণ পড়ে যাওয়ার কারণেই কুরআনের তিন-চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি শিক্ষা এবং তার সত্যিকার স্পিরিটই দৃষ্টি থেকে প্রচ্ছন্ন হয়ে যায়”। (কুরআন কী চার বুনিয়াদী ইসতেলাহেঁ, পৃ: ১৩)
পর্যালোচনা: কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষার অর্থ যদি বিকৃত হয়ে থাকে এবং তার কারণে কুরআনের তিন চতুর্থাংশেরও বেশি বরং মূল স্পিরিটই উধাও হয়ে থাকে এবং মওদূদী সাহেব তা উদ্ধার করে থাকেন, তাহলে বলতে হবে— কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রথম শতাব্দীর পর থেকে মওদূদী সাহেবের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ তেরশ বছর যাবত কুরআন তার অর্থসহ সংরক্ষিত ছিলো না। কুরআনের শাশ্বতের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে? অথচ আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন,
অর্থাৎ, আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং অবশ্যই আমি তার (শব্দ ও অর্থ উভয়টার) সংরক্ষক। (সূরা হিজর: ৯)
মওদূদী সাহেবের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ তেরশ বছর যাবত কুরআনের তিন-চতুর্থাংশের বেশি যদি কেউ বুঝে না থাকেন; অথচ আক্বাইদ, ফিক্হ ও হাদীসের কিতাবাদি সংকলনসহ ইসলামী দুনিয়ার যাবতীয় মৌলিক ও আনুষাঙ্গিক কিতাবাদি প্রায় সবই এ যুগেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তাহলে এসব কিতাবাদি ও তার লেখকগণ কুরআন তথা ইসলাম না বোঝার কারণে নির্ভরযোগ্যতা হারাবেন। এমতাবস্থায় দুনিয়াবাসী ইসলাম পাবে কোথায়? তার এ বক্তব্য একই সাথে কুরআন ও ইসলাম সংরক্ষিত না থাকার প্রতি সুক্ষ ইঙ্গিত বহন করছে।
২. আম্বিয়ায়ে কেরামের ইসমত সম্পর্কে মওদূদী সাহেবের মত:
“আম্বিয়ায়ে কেরাম সম্পর্কে মওদুদী সাহেবের মতামত হচ্ছে— নবীগণ মা’সুম (নিষ্পাপ) নন। প্রত্যেক নবী গুনাহ করেছেন।” (তাফহীমাত: ২য় খণ্ড, পৃৃ: ৪৩)
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত আকিদা হলো— নবীরা নবুওয়তের আগে ও পরে কবীরা গুনাহ (বড় পাপ) ও সগীরা গুনাহ (ছোট পাপ) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও নিষ্পাপ। (শরহুল ফিকহিল আকবার, পৃ: ১০১ দারুল কুুতুবিল ইলমিয়্যাহ, মিসর)
৩. সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও মওদুদী মতবাদ:
মওদূদী সাহেব সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা শুধু জায়েযই মনে করেন না; বরং জরুরী মনে করেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের কঠোর নিন্দাবাদ করেছেন। তাঁদের প্রতি জঘন্য মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছেন এবং তাঁদেরকে অনির্ভরযোগ্য প্রমাণ করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের সময়কার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে লিখেন- “অনেক সময় মানবিক দূর্বলতা সাহাবীদেরকেও আচ্ছন্ন করে ফেলতো এবং তারা পরস্পরের উপর আঘাত করে কথা বলতেন। তিনি “খেলাফত ও মুলূকিয়াত” গ্রন্থে হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা ও হযরত মুআবিয়া (রা.) সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি হযরত উসমান (রা.) এর পর্যন্ত সমালোচনা করেছেন। তিনি হযরত মুআবিয়া (রা.) সম্পর্কে সাহাবা বিদ্বেষী শীআ’ ঐতিহাসিকদের মত খুঁজে খুঁজে বের করে কিংবা ঐতিহাসিকদের ইবারত কাঁট-ছাঁট করে হযরত মুআবিয়া (রা.) এর বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে তুলে ধরেছেন। (খেলাফত ও মুলূকিয়াত পৃ: ১২৭-১৫৩ ও ১৭২-১৮৭, ইদারায়ে তরজমানুল কুরআন, লাহোর)
সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি:
-
“সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম অনেকে মনগড়া হাদিস বর্ণনা করেছেন”। (নাউযুবিল্লাহ্)! (তরজমানুল কোরআন সংখ্যা: ৩৫)
-
“তাদের মধ্যে জাহেলিয়াতের পূর্ব-স্বভাবের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে”। (তাফহীমাত ২য় খণ্ড, ১৫৫ পৃষ্ঠা)
-
“হযরত উসমান (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব পালনে সম্পুর্ণ অযোগ্য ছিলেন”। (নাউযুবিল্লাহ্!) (তাজদীদ ও ইয়াহইয়া দ্বীন, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫, আধুনিক প্রকাশনী ঢাকা)
-
“নবী করীম (সা.) উনার ওফাতের সময় ব্যক্তি সম্মানের কু-মনোবৃত্তি হযরত উমর রা. কে পরাভূত করেছিল। (নাউযুবিল্লাহ্)। (তরজুমানুল কুরআন, রবিউস সানি ১৩৫৭ হিজরী)
-
“হযরত উসমান (রা.) এর মাঝে সজন-প্রীতির বহুগুণ বিদ্যমান ছিল। (নাউযুবিল্লাহ্)। (খেলাফত ও মুলূকিয়াত, পৃষ্ঠা: ১০৬, ইদারায়ে তরজমানুল কুরআন, লাহোর)
-
“হযরত আলী রা. স্বীয় খেলাফতকালে এমন কিছু কাজ করেছেন যাকে অন্যায় বলা ছাড়া উপায় নেই। (নাউযুবিল্লাহ্)। (খেলাফত ও মুলূকিয়াত, পৃষ্ঠা ১৪৬)
-
“হযরত মুয়াবিয়া রা. স্বার্থবাদী, গণিমতের মাল আত্মসাৎকারী, মিথ্যা সাক্ষ্যগ্রহণকারী ও অত্যাচারী ছিলেন”। (নাউযুবিল্লাহ্)। (খেলাফত ও মুলূকিয়াত, পৃষ্ঠা ১৭৩-১৭৬, ইদারায়ে তরজমানুল কুরআন, লাহোর)
পর্যালোচনা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো সকল সাহাবী আদিল বা নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ। অতএব, তাঁরা সমালোচনার উর্ধ্বে। সাহাবীদের সমালোচনা না করা এবং তাঁদের প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা রাখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মৌলিক আকীদা। সাহাবীদের প্রতি মহব্বত ও ভক্তি শ্রদ্ধা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্যতম শি‘আর বা প্রতীক। সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই ভালোবাসা। আকীদার প্রসিদ্ধ কিতাব “মুসামারা”তে বলা হয়েছে, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো- আবশ্যিকভাবে সমস্ত সাহাবীর জন্য “আদালত” গুণ মেনে নিয়ে তাঁদেরকে পবিত্র সাব্যস্ত করা, তাঁদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা থেকে বিরত থাকা এবং তাঁদের প্রশংসা করা”। (মুসামারা পৃ: ২৫৯, মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ, ঢাকা)। আকীদাতুত্তাহাবীর ব্যাখ্যা গ্রন্থে বলা হয়েছে, “আমরা তাঁদের ভালো বৈ মন্দের উল্লেখ করি না। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা দ্বীন, ঈমান এবং ইহসান আর বিদ্বেষ রাখা কুফর, নিফাক এবং সীমালঙ্ঘন”। (শরহু আকিদাতু ত্বাহাবী —ইবনে আবিল ঈয আল হানাফি— ২/৬৮৯, মুয়াসসাতুর রিসালা, বৈরুত)
সাহাবীদের সমালোচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবূ সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, “তোমরা আমার সাহাবীদের সমালোচনা করো না। ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় করে, তবুও সে তাঁদের (সাহাবাদের) এক মুদ বা তার অর্ধ পরিমাণেও পৌঁছতে পারবে না”। (সহীহ বুখারী, হাদীস-৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৫৪০)
আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.) বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, “তোমরা আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, তোমরা আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আমার পর তোমরা তাঁদেরকে সমালোচনার পাত্র বানাবে না। যে তাঁদেরকে ভালোবাসলো, সে আমার প্রতি ভালবাসার কারণেই তাঁদেরকে ভালোবাসলো। আর যে তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ রাখলো, সে আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণেই তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ রাখল”। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস-৩৮৬২)
৪. মাওলানা মওদুদী ও তাকলীদ:
ফিক্হ, তাকলীদ এবং ইজতিহাদ সম্পর্কে মওদূদী সাহেব অত্যন্ত ভিত্তিহীন নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি জমহুরে উম্মতের বিপরীতে গিয়ে বলেন, “আমার মতে দ্বীনী ইলমের ক্ষেত্রে বুৎপত্তি রাখেন এমন ব্যক্তির জন্য তাকলীদ নাজায়েয এবং গুনাহ, বরং তার চাইতেও সাংঘাতিক”। (রসায়েল ও মাসায়েল ১/১৪৮, শতাব্দী প্রকাশনী ঢাকা)
এছাড়াও তিনি তার লেখায় মুক্ত-বুদ্ধি প্রয়োগ এবং মুক্ত মনে কুরআন অধ্যয়ন ও গবেষণার প্রতি যেভাবে সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন- তাতে তার অনুসারীগণ তাকলীদ তথা ইমামগণের অনুসরণ করার ব্যাপারে অত্যন্ত বল্গাহীনতার শিকার হয়ে পড়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা অত্যন্ত বিপদজনক বিষয়। যদিও তিনি ‘সাধারণ লোকেরা তাক্বলীদ করতে পারে’ বলে মত দিয়েছেন, কিন্তু তার মতে আলেমদের পক্ষে তাকলীদ করা নাজায়েয। আবার তার দৃষ্টিতে আলেম হওয়ার জন্য নিয়মতান্ত্রিক কোনো আলেমের কাছে পড়াশুনার প্রয়োজন না থাকায় কার্যত সকলের জন্যই তাকলীদহীন হয়ে যাওয়ার অবকাশ তৈরি হয়েছে। আর বাস্তবেও তার অনুসারীবৃন্দের মধ্যে তাকলীদ বিষয়ে এমন বল্গাহীনতাই লক্ষ করা যাচ্ছে। উম্মতের কেউ গায়রে মুজতাহিদদের জন্য তাকলীদের বিষয়ে এতখানি বল্গাহীন হওয়াকে জায়েয মনে করেন না।
৫. তাসাওউফ সম্পর্কে মওদুদী সাহেবের বিভ্রান্তি:
মওদূদী সাহেবের মতে তাসাওউফের প্রচলিত পীর-মুরিদী তরীকা একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষয় এবং এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরী। প্রচলিত পীর-মুরিদী ও খানকাহভিত্তিক তাসাউফের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং একে ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করতেন। তিনি এ ব্যাপারে মুজাদ্দিদে আলফে সানী ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এর পর্যন্ত সমালোচনা করেছেন। যদিও তিনি মূল তাসাওউফ বা ইহসানকে অস্বীকার করেন না বলে দাবী করেছেন। কিন্তু চিরাচরিত ও সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি ও পীর মুরীদির প্রচলিত তরীকার এবং সর্বজনস্বীকৃত পীর-মাশায়েখগণের যেভাবে ঢালাও সমালোচনা করেছেন, তাতে তাসাওউফের স্বীকৃত অংশ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। এরূপ স্বীকৃতি বাস্তবে অস্বীকৃতিরই নামান্তর, তাই বাস্তবেও মওদূদী সাহেবের চিন্তাধারায় বিশ্বাসী লোকজন তাসাওউফের সাথে কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা রাখেন না। (ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন পৃ: ৬৫-৯৩ ও ১০৪-১০৮, আধুনিক প্রকাশনী ঢাকা)
পর্যালোচনা: ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে শরীয়তভিত্তিক আধ্যাত্মিক শিক্ষাদীক্ষা বা পীর-মুরিদীর ধারা যুগ যুগ থেকে চলে আসছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, পৃথিবীতে অস্ত্রবলে ইসলাম বিস্তার লাভ করেনি। সূফী-সাধক, আওলিয়া-দরবেশ ও পীর-মাশায়েখদের মাধ্যমেই ইসলামের প্রচার প্রসার ঘটেছে। বিশেষ করে, উপমহাদেশে তারাই এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। এক্ষেত্রে কোনো মুসলিম রাজা-বাদশাহ কিংবা তথাকথিত স্বঘোষিত ইসলামিক ভাষ্যকারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা অবদান চোখে পড়ার মতো না। পীর-ফকির নামধারী দু'চারজনের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সমালোচনা থাকলেও সবার বিরুদ্ধে এবং সুফিবাদ সম্পর্কে ঢালাও সমালোচনা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। এ হচ্ছে বাস্তব ইতিহাস। একথা কারো পক্ষে অস্বীকার করার উপায় নেই।
সারকথা- মওদূদী সাহেব ও তার মতাদর্শপন্থীদের চিন্তাধারা ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী থেকে শুরু করে প্রায় সমস্ত মৌলিক বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্যুত। তারা সমগ্র উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব মস্তিষ্ক ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উপরোক্ত ধারাগুলো তাদের বুনিয়াদী বিচ্যুতিগুলোর তুলনায় অতি সামান্য। তারা ইসলাম ও মুসলমানের পরিচয়টাও পাল্টে দিয়েছেন, ইবাদত-বন্দেগীর পরিচয়ও পাল্টে দিয়েছেন, দ্বীন ধর্মের এবং শরীআতের পরিচয়ও পাল্টে দিয়েছেন। এমনকি পাল্টে দিয়েছেন ইলাহ বা মা'বুদের সংজ্ঞাও। বক্ষমাণ নিবন্ধে সেগুলোর বিস্তর আলোচনার অবকাশ নেই, তবে এতটুকু নির্দিধায় বলা যায় যে, ইসলামের এসব প্রধান মৌলিক বিষয়গুলোর পরিচয় ও স্বরূপ পাল্টে দেয়ার ফলে মওদূদী সাহেব ও তার অনুসারীদের পেশকৃত ইসলাম আর মদিনার ইসলাম থাকেনি। অতএব বলা যায়, মওদূদী সাহেব এক নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটিয়েছেন আর তার অনুসারীগণ সেই নতুন ধর্মই অনুসরণ ও প্রচার করে চলেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে সকল ফেতনা থেকে হেফাজক করুন, আমীন।
সংকলনে : মুফতি জোবায়ের হোসাইন, মুহাদ্দিস: শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা






