মাসায়েল ২৪
সহযোগিতা

সফর মাসের তাৎপর্য, ইতিহাস ও প্রচলিত কুসংস্কার নিরসন (The Month of Safar)

মুফতি শরীফ মালিক
•
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৪৫০ বার পঠিত
শেয়ার করুন:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।

হিজরি বর্ষপঞ্জিকার বারটি মাসের মধ্যে দ্বিতীয় মাস হলো সফর (صفر)। মহররম মাসের ঠিক পরেই এই মাসের আগমন। প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ইবনুল মানযূর (রহ.) রচিত লিসানুল আরব (খণ্ড ৪, পৃ. ৪৬২-৪৬৩) গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ‘সফর’ নামকরণের অন্যতম কারণ হলো—এই মাসে মক্কাবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সফরের উদ্দেশ্যে শহর ত্যাগ করত, ফলে মক্কা নগরী শূন্য (ইসফার) হয়ে যেত। এছাড়াও সফর শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো রিক্ত বা খালি হওয়া।

প্রবন্ধের মূল সূচিপত্র:

  • ১. জাহেলি যুগে আরবদের কুসংস্কার ও নাসী (পবিত্র মাস পেছানো)
  • ২. পবিত্র কুরআনের বিধান (সূরা তাওবাহ: আয়াত ৩৬)
  • ৩. সহীহ সুন্নাহর আলোকে কুসংস্কার ও অশুভ লক্ষণের খণ্ডন
  • ৪. সফর মাসের শেষ বুধবারের মনগড়া সালাতের বিদআত নিরসন
  • ৫. সফর মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক সামরিক অভিযান ও বিজয়াভিযান
  • ৬. সফর মাস নিয়ে প্রচলিত জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা সম্পর্কে সতর্কতা

১. জাহেলি যুগে সফর মাস নিয়ে আরবদের বিভ্রান্তি

জাহেলি যুগে আরবের মুশরিকরা সফর মাস সম্পর্কে দুটি মারাত্মক পাপে লিপ্ত ছিল:

  1. নাসী (النسيء) বা মাস পেছানো: তারা নিজেদের যুদ্ধপ্রিয়তা ও মনগড়া ইচ্ছা অনুযায়ী পবিত্র চার মাসের ধারাবাহিকতা পরিবর্তন করে সফরকে হারাম মাস বানিয়ে মহররমের মর্যাদা হরণ করত অথবা মহররমকে পিছিয়ে দিত।
  2. অশুভ লক্ষণ ও কুসংস্কার বিশ্বাস: তারা সফর মাসকে বালা-মুসিবত ও অপয়া মাস মনে করত এবং এ মাসে বিবাহ, বড় ব্যবসা কিংবা হজের উমরাহ পালনকে অশুভ মনে করত।

২. পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই বারটি মাস নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ

“নিশ্চয় আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কিতাবে মাসের গণনা বারটি, যার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন; সুতরাং তোমরা এসব মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৩৬)

৩. সহীহ সুন্নাহর আলোকে কুসংস্কার ও কুলক্ষণের মূলোৎপাটন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলি যুগের এই ভিত্তিহীন কুলক্ষণ ও কুসংস্কারকে সমূলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الْأَسَدِ

অর্থ: “কোনো সংক্রামক ব্যাধি (আল্লাহর হুকুম ছাড়া নিজে নিজে) সংক্রমিত হয় না, কোনো অশুভ কুলক্ষণ নেই, প্যাঁচার ডাকে কোনো অমঙ্গল নেই এবং সফর মাসের মধ্যেও কোনো অশুভ বা কুলক্ষণ নেই। আর কুষ্ঠ রোগী থেকে এমনভাবে দূরে থাকো যেমন সিংহ থেকে পালিয়ে থাকো।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫৩৮৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২২০)

৪. সফর মাসের শেষ বুধবারের মনগড়া সালাতের বিদআত নিরসন

আমাদের সমাজে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে যে—সফর মাসের শেষ বুধবার ৩ লক্ষ ২০ হাজার বালা-মুসিবত নাযিল হয় এবং তা থেকে বাঁচতে বিশেষ নিয়মে চার রাকাত ‘নফল নামাজ’ পড়তে হয়।

সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আলেমদের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৪) সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে:

“কুরআন ও সুন্নাহতে এই বিশেষ নামাজের কোনো প্রমাণ নেই। সালাফে সালেহীন বা পরবর্তী যুগের কোনো নির্ভরযোগ্য ফকীহ থেকে এর কোনো দলিল পাওয়া যায় না। এটি একটি প্রত্যাখ্যাত বিদআত। যে ব্যক্তি এই আমলকে রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবায়ে কেরামের দিকে নিসবত করে, সে জঘন্য মিথ্যা রচনা করে।”

৫. সফর মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক জিহাদ ও বিজয়াভিযান

সফর মাস যদি অপয়া বা অমঙ্গলের মাস হতো, তবে ইসলামের ইতিহাসের মহান মোবারক ঘটনাসমূহ এই মাসে সংঘটিত হতো না। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) যাদুল মাআদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:

  • গাযওয়ায়ে আবওয়া (ওয়াদ্দান): হিজরতের ১২ মাস পর সফর মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে স্বশরীরে প্রথম সামরিক অভিযানে বের হন এবং বনু দুমরাহর নেতা মাখশী ইবনে আমরের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন।
  • খায়বার বিজয়: ৭ম হিজরীর সফর মাসে মুসলমানরা ইয়াহুদিদের শক্তিশালী দুর্গ খায়বার বিজয় লাভ করেন।
  • উযরাহ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ: ৯ম হিজরীর সফর মাসে উযরাহ গোত্রের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং শামে ইসলামের বিজয়ের শুভসংবাদ লাভ করেন।

৬. সফর মাস নিয়ে প্রচলিত জাল বর্ণনা

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) আল-মানার আল-মুনিফ (পৃ. ৬৪) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন—ভবিষ্যতের বিপদ-আপদ, অমুক তারিখে চাঁদগ্রহণ হলে সফর মাসে দুর্ভিক্ষ হবে বা যুদ্ধ লাগবে—এ জাতীয় যত বর্ণনা রয়েছে, তার সবই স্পষ্ট জাল, বানোয়াট ও মিথ্যাচার।

📥 পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য গবেষণাপত্র (১২ পৃষ্ঠার মূল PDF):

শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও তত্ত্বাবধায়িত Islam Question & Answer-এর মূল ১২ পৃষ্ঠার ইংরেজি গবেষণাপত্রটি সংগ্রহ করতে উপরের “পড়ুন” অথবা “ডাউনলোড করুন” বোতামে ক্লিক করুন।

শ

মুফতি শরীফ মালিক

লেখক

শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুফতি, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

শেয়ার করুন: