সংক্ষিপ্ত এ পুস্তিকায় যাকাতের বিভিন্ন জরুরী মাসাইল ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত করে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো। অবশেষে জানার বিষয় হলো, শরীয়তের বিধি-নিষেধ মেনে মালিকানাধীণ বিভিন্ন প্রকারের যাকাতযোগ্য সম্পদের যাকাত হিসাব করার সহজ উপায় কী?
এ ব্যাপারে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করা হলো।
এ অধ্যায়ে কয়েকটি বিষয় অনুধাবনযোগ্য:
১. মানব জীবনে উপার্জনের মাধ্যম ব্যবসা-বানিজ্য কৃষিকাজ বা চাকুরি যা-ই হোক, প্রকৃতপক্ষে সবকিছুর প্রদায়ক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। কিন্তু দুনিয়ার বুকে আল্লাহ মানুষকে একটি সীমাবদ্ধ কাজের জন্য প্রেরণ করেছেন, তবে ওই সীমাবদ্ধ কাজের মধ্যে কোনো জিনিষ সৃষ্টি করার যোগ্যতা মানুষকে দেয়া হয়নি। সৃষ্টি করা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং যা কিছু মানুষের কাছে আছে সবকিছুই আল্লাহপ্রদত্ত। আল্লাহ তায়ালা সব কিছু মানব জাতির জন্যই সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُمْ مِمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا فَهُمْ لَهَا مَالِكُونَ
অর্থ: তারা কি দেখে না? তাদের জন্য আমি আমার নিজ হাতের তৈরী বস্তুর দ্বারা চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি, অতপর তারাই এগুলির মালিক। (সূরা ইয়াসিন: ৭১)
তাহলে বুঝা গেল, মানব জাতির হস্তগত সম্পদে সব চেয়ে বড় হক হলো আল্লাহ তায়ালার। সুতরাং এ সম্পদ ব্যয় করতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত খাতে। যদি আল্লাহ তায়ালা এমন দাবী করতেন যে, এ সম্পদ আমার দেয়া তা থেকে শতকরা আড়াই টাকা তুমি রাখ আর সাড়ে সাতানবক্ষই টাকাই আমার রাস্তায় ব্যয় কর, তাহলে এটি অবিচার হতো না। অথচ তিনি তা দাবী করেন নি।
২. শতকরা মাত্র আড়াই টাকা যাকাত দিবে।
তিনি তার বান্দার প্রতি অপার অনুগ্রহ করে বলেছেন যে, আমি জানি তোমাদের সম্পদের প্রয়োজন বেশি। সম্পদের প্রতি রয়েছে তোমাদের তীব্র আকর্ষণ। সুতরাং সম্পদের মাত্র শতকরা আড়াই টাকা যাকাত দাও আর সাড়ে সাতানবক্ষই টাকা তোমরাই রাখ। আল্লাহ এ সামান্য প্রত্যাশা পুরণের ঘোষণা দিয়ে সমূদয় সম্পদ আমাদের কাছে অর্পণ করে দিয়েছেন এবং বাকি সম্পদ আমাদের ইচ্ছেমতো বৈধ খাতে ব্যয় করার অনুমতি দিয়েছেন।
৩. নিখুঁতভাবে হিসাব করবে।
তাই শতকরা আড়াই টাকা বের করার জন্য সমূদয় সম্পদ নিখুতভাবে হিসাব করতে হবে। অন্যথায় অবশিষ্ট সম্পদ হালাল করা সম্ভব হবে না। একথা মনে করা ঠিক হবে না যে, নিখুতভাবে হিসাব করার দরকার কি? এভাবে হিসাব কষে আড়াই টাকা বের করাতো কঠিন ব্যাপার। আল্লাহ কেন এত কষ্টসাধ্য কাজ চাপিয়ে দিলেন? কোনো রকম যাকাত আদায় করাই যথেষ্ট। এ ধরণের উক্তি জঘন্য অন্যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব মোটেই কষ্টসাধ্য নয়। কিছুটা কষ্টকর হলেও এটা আল্লাহর নির্দেশ যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা আবশ্যক।
৪. যাকাতের হিসাব করার জন্য তারিখ নির্ধারণ করবে।
যাকাতের হিসাব কষা সহজ করার জন্য যাকাতদাতা একটি তারিখ নির্ধারণ করে নিতে হবে। সেটা হচ্ছে, আপনি যে দিন যে তারিখে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন, পরবর্তী বছর ওই তারিখেই তার এক বছর পূর্ণ হবে। এটাই আপনার যাকাতের বছরপূর্তি। যদি আপনি কোন তারিখে নিসাবের মালিক হলেন, তা স্মরণ না থাকে তাহলে অনুমান করে একটি তারিখ নির্ধারণ করে নিন। পরবর্তী বছরসমূহে সে তারিখ অনুসরণ করে যাকাতের হিসাব করতে হবে।
৫. প্রতি টাকায় বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়।
আপনি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তার উপর এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরী। তবে প্রতি টাকার উপর বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরী নয়। কারণ পুরো বছর যত টাকা হাতে আসবে প্রত্যেক টাকার উপর বছর কখন পূর্ণ হচ্ছে তা হিসাব করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যাকাত হিসাবের সঠিক নিয়ম হলো, বছরের যে তারিখে আপনি নিসাবের মালিক হলেন, পরবর্তী বছরের ওই দিনে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তাহলে যাকাত দিতে হবে। আর যদি ওই তারিখে আপনার সম্পদ কমে যাওয়ায় নিসাব পূর্ণ না হয়, তাহলে যাকাত দিতে হবে না। সুতরাং ওই তারিখে নিসাবের মালিকানা বহাল থাকলে সম্পদের হিসাব করুন, আজকের এ তারিখে আপনার মালিকানায় যাকাতযোগ্য সম্পদ কত আছে? সবগুলোর মূল্যমান কত হয়, যা হবে তার শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত আদায় করুন। বাকি রইলো বছরের মাঝখানে অনেক সম্পদ বেশি ছিলো যা বর্তমানে নেই, অথবা কম ছিলো বছরপূর্তিতে হঠাৎ বেশি হয়ে গেছে, তার হিসাব কীভাবে হবে?
এর সমাধান হলো, বছরের মধ্যবর্তী সময়ে আপনার সম্পদের আপ-ডাউন দেখার এবং হিসাব করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা এভাবে হিসাব করা সম্ভব নয়, করতে গেলে জনজীবন অচল হয়ে পড়বে। দেখুন কত সহজ উপায়ে যাকাতের হিসাব সুবিন্যাস্ত করা হলো।
যাকাত হিসাব করার একটি উদাহরণ :
মনে করুন আপনি রমযানের ১ম তারিখে এক লক্ষ টাকার মালিক হয়ে নিসাবের মালিক হয়েছেন। পরবর্তী বছর রমযানের ১ম তারিখ আপনার যাকাত হিসাব করার নির্ধারিত তারিখ। এ তারিখে হিসাবের পর দেখা গেছে যাকাতযোগ্য সম্পদ বা নগদ অর্থ আপনার কাছে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে। এ অবস্থায় আপনাকে শতকরা আড়াই টাকা হারে দেড় লক্ষ টাকার যাকাত আদায় করতে হবে। যদিও আপনার সম্পদ বছরের মাঝে কমে মাত্র পঞ্চাশ হাজার হয়েছিলো যা প্রায় ছয় মাস বলবত ছিলো। হঠাৎ রমযান মাসের মাত্র দুই দিন পূর্বে এক লক্ষ টাকা যোগ হয়ে প্রথম রমযানে দেড় লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। তা সত্বেও আপনাকে আজকের ক্যাশ ধরেই হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ দেড় লক্ষ টাকার যাকাত দিতে হবে।
পক্ষান্তরে যাকাত বের করার দিন হিসাব করে দেখলেন যে, বছরের শুরুতে যে এক লক্ষ টাকার মালিক ছিলেন, তা কমে আজ অবশিষ্ট আছে মাত্র ৬৫,০০০। বাকি টাকা বছরের মাঝে ব্যয় হয়ে গেছে। তাহলে আপনাকে মাত্র ৬৫,০০০ টাকার যাকাত প্রদান করলেই যথেষ্ট হবে। আর যদি যাকাতের তারিখে সম্পদ কমে মাত্র ৪০,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ৫২.৫ তোলা রূপার নিসাবই পৌঁছেনা, তাহলে আপনাকে যাকাতই দিতে হবে না।
৬. যাকাতের সম্পদ হিসাব করার নিয়ম।
যাকাতের হিসাব করতে গেলে আপনাকে কিছু সম্পদ যোগ করতে হবে আর কিছু বিয়োগ করতে হবে। যোগের সমষ্টি থেকে বিয়োগযোগ্য সমষ্টি বের করে অবশিষ্ট অংশের ফলাফল যা দাঁড়াবে কেবল তারই শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হবে। আর এ হিসাবটা করতে হবে চন্দ্র মাসের সুনির্দিষ্ট তারিখে, যেটা আপনি যাকাত হিসাব করার জন্য নির্ধারণ করেছেন।
আসুন নিম্নে যাকাত হিসাব করার নিয়ম দেখে নেই:
প্রথমে যাকাতযোগ্য সম্পদের তালিকা তৈরী করি।
আপনার যাকাতযোগ্য সম্পদ নিম্মরূপ:
১. স্বর্ণ (GOLD) চাই কাঁচা স্বর্ণ হোক যেমন, বিস্কেট ইত্যাদি অথবা জুয়েলারী আকৃতিতে হোক, যেমন চুড়ি, চেইন, হার, ইত্যাদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে গচ্ছিত থাকুক বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সর্বাবস্থায় তার যাকাত দিতে হবে। [মনে করুন] থাকা স্বর্ণের বাজার মূল্য ২,০০,০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
২. আপনি রূপার (SILVER) মালিক। যে কোনো আকৃতিতে হোক এবং যেকোনো উদ্দেশ্যে আপনার মালিকানায় রক্ষিত থাকুক, তার যাকাত দিতে হবে।
৩. নগদ অর্থ, নগদায়নযোগ্য অর্থ ও আপনার প্রাপ্য ঋণ (CASH, CASHABLES, RECEI ABLES)
এ পদের সম্পদের বহু প্রকার হতে পারে যেমন:
ক. নিজ হাতে কিংবা কোন ব্যক্তি বিশেষের নিকট গচ্ছিত নগদ টাকা। [মনে করি] ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
খ. আপনার ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ কাজ সম্পাদন যেমন, হজ্ব পালন, বিবাহ, বাড়ি নির্মাণ কিংবা ব্যবসা শুরু করার নিয়তে জমাকৃত নগদ অর্থ। [মনে করি] ১০,০০০০০/- দশ লক্ষ টাকা।
গ. আপনার নিকট রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা যেমন ডলার, রিয়াল, দিরহাম, দিনার, পাউন্ড, ইউরো ইত্যাদি।
[মনে করি] এর মূল্যমান ৫,০০,০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
ঘ. ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন একাউন্টে (যথা, কারেন্ট, সেভিংস, ফিক্সড, লকার, DPS, FDR ইত্যাদি) আপনার জমাকৃত অর্থ। [মনে করি] ১০,০০০০০/- দশ লক্ষ টাকা।
ঙ. আপনার ফেরতযোগ্য বীমা পলিসিতে জমাকৃত প্রিমিয়াম। [মনে করি] এর পরিমাণ ১,০০০০০/- এক লক্ষ টাকা।
চ. আপনার নিকট রক্ষিত যে কোনো ধরণের বন্ড, ডিবেঞ্চার ও ট্রেজারী বিল ইত্যাদির ক্রয় মূল্য। [মনে করি] ২,০০০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
ছ. ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের সমূদয় অর্থ বা বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ডের সাথে স্বেচ্চায় প্রদত্ত অতিরিক্ত অংশ। [মনে করি] এর পরিমাণ ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
জ. আপনার ঋণ হিসাবে কাউকে প্রদত্ত অর্থ যদি তা প্রাপ্তির প্রবল সম্ভাবনা থাকে এবং গ্রহীতা তা স্বীকার করে। [মনে করি] এর পরিমাণ ২,০০,০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
ঝ. আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিক্রিত পণ্যের মূল্য যা গ্র্রাহকদের নিকট পাওনা। তবে এখনো হস্তগত হয়নি অথবা বিল অফ এক্সচেঞ্জ। [মনে করি] এর পরিমাণ দাড়ায় ৫,০০,০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
ঞ. ফ্ল্যাট, বাড়ি, দোকান ইত্যাদি ভাড়া নেয়ার সময় সিকিউরিটি বা এ্যাডভান্স হিসাবে প্রদত্ত ফেরতযোগ্য অর্থ। [মনে করি] ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
উল্লেখ্য, “জ” “ঝ” ও “ঞ” যথা ঋণ হিসাবে প্রদত্ত অর্থ, বিক্রিত পণ্যের মূল্য বাবত পাওনা, বিল অফ এক্সচেঞ্জ এবং ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি বা এ্যাডভান্স। এই তিন প্রকারের সম্পদের যাকাত এখনই দেয়া জরুরী নয়। বরং যখন নিসাব পরিমাণের নুন্যতম এক পঞ্চামাংশ হস্তগত হবে তখন আদায় করলেও চলবে। তবে তখন বিগত বছরগুলোর যাকাত আদায় করতে হয়। বিধায়, প্রত্যেক বছরই অন্যান্য সম্পদের সাথে এগুলোর যাকাত আদায় করে দেয়া ভালো। যেন পরবর্তীতে চাপ না হয়ে যায়।
৪. আপনার সমূদয় ব্যবসাপণ্য (BUSINESS GOODS) যার ধরণ নিম্নরূপ। যেমন:
ক. ফ্যাক্টরীতে, শো-রুমে বা দোকানে বিক্রয়যোগ্য মজুদ মাল এবং উৎপাদিত মজুদ পণ্য। [মনে করি] এর মূল্য ২০,০০,০০০/- বিশ লক্ষ টাকা।
খ. কারখানায় মজুদ কাঁচা মাল (RAW MATERIAL) [মনে করি] এর মূল্যমান ১০,০০,০০০/-দশ লক্ষ টাকা।
গ. কারখানাতে প্রক্রিয়াধীনপণ্য ও প্যাকেটিং-প্যাকেজিংপণ্য। [মনে করি] এর মূল্য ৫,০০,০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
ঘ. এমন বস্তু যা বিক্রি করে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়েছে এবং সে নিয়ত এখনও বিদ্যমান আছে, তা এখনো কিন্তু বিক্রি করা হয়নি। যেমন, বিক্রির নিয়তে ক্রয়কৃত যমিন, প্লট, ফ্ল্যাট, আলু, পিয়াজ, মরিচ, চিনি, বাদাম, ডাল, চাল ইত্যাদি। [মনে করি] এর বাজার মূল্য ২,০০,০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
ঙ. অংশীদারী, মুদারাবা কারবারে বিনিয়োগকৃত অর্থের নগদ অংশ ও সে অর্থের দ্বারা খরিদকৃত ব্যবসাপণ্য এবং যাকাতযোগ্য লভ্যাংশ। [মনে করি] এর মূল্য ৩,০০০০০/- তিন লক্ষ টাকা।
চ. ক্রয়কৃত মালিকানাধীন যাবতীয় শেয়ার (ঝঐঅজঊ)। [মনে করি] এর মূল্য ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
উল্লেখ্য, কোম্পানীর শেয়ার যদি (CAPITAL GAIN) বিক্রি করে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ক্রয় করেন, তার বাজারমূল্যের উপর যাকাত দিতে হবে। আর যদি কোম্পানী থেকে বাৎসরিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ক্রয় করে থাকেন, তাহলে কোম্পানীর যে পরিমাণ সম্পদ যাকাতযোগ্য, শেয়ার প্রতি তার আনুপাতিক হারে সে পরিমাণ অংশের যাকাত দিবেন। এটা নির্ণয় করার সহজ উপায় হচ্ছে, কোম্পানীর ব্যালেন্স শীট। (এর বিবরণ পুর্বে গত হয়েছে)
এ ছিলো যাকাতযোগ্য সম্পদের মোটামুটি হিসাব। এগুলির মোট পরিমাণ দাঁড়ালো ৮০,০০,০০০/- আশি লক্ষ টাকা। (GROSS ZAKATABLE WORTH)
দ্বিতীয়ত: আপনার যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগযোগ্য ঋণের (LIABILITIES) তালিকা:
১. সম্পদ বৃদ্ধি বা ব্যবসার উদ্দেশ্য ব্যতীত অর্থ। যেমন, চিকিৎসা, সাংসারিক বা এ ধরণের প্রয়োজনে আপনার গ্রহীত ঋণ যার পরিমাণ ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
২. বাকিতে ক্রয়কৃত পণ্যের অপরিশোধিত মূল্য বা কিস্তি যা এ বছরই আদায় করার ওয়াদা, যার পরিমাণ ৩,০০,০০০/- তিন লক্ষ টাকা।
৩. স্ত্রীর মোহর যা চলতি বছর আদায় করার ইচ্ছা আছে, যার পরিমাণ ২,০০,০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
৪. আপনার ফেরতযোগ্য সিকিউরিটি কিংবা এ্যাডভান্স অর্থ যা ফ্ল্যাট, বাড়ি, দোকান ভাড়া দিয়ে গ্রহণ করেছেন। যার পরিমাণ ৩,০০,০০০/- তিন লক্ষ টাকা।
৫. আপনার কর্মচারীদের অনাদায়ী বেতন-ভাতা। যার পরিমাণ ২,০০০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
৬. আপনার বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, মোবাইল, ফোনবিল এবং ট্যাক্স, বাড়িভাড়া, দোকানভাড়া ইত্যাদি আদায়যোগ্য ঋণ যা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। [মনে করি] এর পরিমাণ ২,০০০০০/- দুই লক্ষ টাকা।
৭. অতীত বছরগুলোর যাকাত যা এখনো আদায় করা হয়নি। এগুলি পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে হবে। তাই এগুলি পরিশোধযোগ্য ঋণ থেকে বিয়োগ দিবে। [মনে করি] এর পরিমাণ ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
৮. সুদ বা হারাম পন্থায় অর্জিত টাকা যা বৈধ সম্পদ থেকে পৃথক করা অসম্ভব নয় তা বিয়োগযোগ্য অর্থ। কারণ, এ সম্পদ সাওয়াবের নিয়ত ব্যতিরেকেই প্রকৃত মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দিতে হবে। তাই এগুলি আপনার সম্পদই নয়। [মনে করি] এর পরিমাণ ৫,০০০০০/- পাঁচ লক্ষ টাকা।
৯. কমার্শিয়াল লোন যা সম্পদ বৃদ্ধি বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যাংক বা অন্য কারো থেকে নেয়া হয়েছে। যা দ্বারা যাকাতযোগ্য সম্পদ ক্রয় করা বা বিনিয়োগ করা হয়েছে। যেমন, কাঁচা মাল ইত্যাদি। [মনে করি] এর পরিমাণ ৮,০০,০০০/- আট লক্ষ টাকা।
সর্বমোট আদায়যোগ্য ঋণ দাঁড়ালো ৩৫,০০,০০০/- পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা।
উল্লেখ্য, যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নেয়া ঋণের অর্থ দ্বারা যাকাতযোগ্য সম্পদ ক্রয় করা না হয়, বরং বিল্ডিং, গাড়ি বা মেশিনারী খরিদ করা হয়, তাহলে এ ঋণ যাকাতের হিসাব থেকে বিয়োগ করা যাবে না ।
সারকথা: মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ তথা ZKATABLE WORTH-এর পরিমাণ দাঁড়ালো ৮০,০০,০০০/- আশি লক্ষ টাকা।
সর্বমোট বিয়োগযোগ্য ঋণ তথা LIABILITIES দাঁড়ালো ৩৫,০০,০০০/- পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা।
অবশিষ্ট যাাকাতযোগ্য সম্পদ তথা NET ZKATABLE WORTH আছে, ৪৫,০০,০০০/- পঁয়তাল্লিশ লক্ষ টাকা।
এ অর্থের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা হচ্ছে আদায়যোগ্য যাকাত। (AMOUNT PAYABLE) যার পরিমাণ ১,১২,৫০০/- এক লক্ষ বারো হাজার পাঁচশত টাকা।
বি:দ্র: আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন, নওজাওয়ান আলেমে দ্বীন, আমার উস্তাদে মুহতারাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানী সাহেবের সুযোগ্য ছাত্র, ঢালকানগর মাদরাসার মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতি, মাওলানা মুফতি শাব্বির আহমদ সাহেব এর সংকলিত “যাকাতের মাসায়েল” নামক বইটির শেষাংশে তিনি চমৎকার একটি নকশা পেশ করেছেন। পাঠকদের যাকাত আদায়ের সুবিধার্থে “যাকাত আদায়ের নমুনা ফরম” শিরোনামে তার প্রদত্ত নকশাটি এখানে তুলে দেয়া হলো। আল্লাহ তায়ালা লিখককে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন \